Tuesday, April 01, 2008

আরবি-ফারসির র, বাংলায় ড়

আরবি বা ফারসির র বাংলায় ড় হয়ে যায়। সবক্ষেত্রে অবশ্যই নয়। তবে কোন্‌ কোন্‌ ক্ষেত্রে তার পুরোটা এখনও হয়ত জানা যায় নি। আপাতত দুটো উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আজুড়ে বা আজাড়ে প্যাঁচাল, অর্থাৎ বেহুদা বা অত্যধিক বক্তৃতা — বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান মতে আজুড়ে শব্দটার মূল ফারসি আজার (آزار, অর্থ অসুবিধা, বিরক্তি, উচ্ছৃঙ্খলা, ঝগড়া, অত্যাচার ইত্যাদি), সাথে বাংলা ইয়া প্রত্যয় যোগে আজাড়িয়া (ঢাকার ভাষায় প্রায়ই শোনা যায় আজাইরা, অপিনিহিতির উদাহরণ) এবং সেখান থেকে আজাড়ে, অভিশ্রুতি, এবং সেখান থেকে আজুড়ে। অনেক অভিধানে শব্দটি নেই আবার বাংলা একাডেমির বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে শব্দটি ব্যুৎপত্তি অন্যভাবে দেখানো হয়েছে; চলন্তিকা মতে যার জাড় (জড়) বা মূল নাই, অমূলক, যেমন আজাড়িয়া গল্প।

তেমনি ভাবে গোমড়া মুখ, অপ্রসন্ন, গুমট, মেঘাছন্ন অর্থে। ফারসিতে গুমরাহ্‌ (گمراه, অর্থ পথ-ভ্রষ্ট, বঞ্চিত, হতবুদ্ধি ইত্যাদি), অন্তত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান মতে। বাঙ্গালা ভাষার অভিধান মত শব্দটি ফারসি গুমান (گمان, অর্থ মত, ধারণা, পছন্দ, চিন্তা, সন্দেহ, অবিশ্বাস ইত্যাদি, যা পহ্‌লবি গুমান gumān থেকে আগত) > হিন্দি গুমর (गुमर, অর্থ অভিমান, অহঙ্কার) থেকে ব্যুৎপন্ন।

বাংলার ফেঁকড়া বা ফ্যাঁকড়াও, মূল বিষয়ের আনুষাঙ্গিক বিঘ্ন অর্থে, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান মতে আরবির ফিক়রাহ (فقرة, অর্থ চিহ্ন, উদ্দেশ্য ইত্যাদি) থেকে আগত। যদিও জ্ঞানেন্দ্রমোহনে শব্দটির উৎপত্তি হিসেবে তিনটি ভাষার শব্দ দেওয়া আছে, ওড়িয়া ফাঁকড়া (ଫାଁକଡ଼ା), সংস্কৃত ফর্ফরীক (फर्फरीक) আর অসমিয়া ফেরকেটা (ফেৰকেটা) । বাংলা একাডেমির অভিধানে আরবি শব্দের সাথে ওড়িয়া এবং সংস্কৃত শব্দদুটি দেওয়া আছে। আরবি থেকে এসে থাকলে শব্দটিতে র > ড় হতে পারে, কিন্তু চন্দ্রবিন্দুর কোন জায়গা দেখতে পাওয়া যায় না। হয়ত ওড়িয়া ফাঁকড়ার প্রভাব পড়ে থাকতে পারে।

যদি আরবি-ফারসির ব্যুৎপত্তিগুলো ঠিক হয় তাহলে বলা যায় যে ফারসি বা আরবির র বাংলায় ড় হিসেবে দেখা যায়, ঠিক কতগুলো শব্দে তা বলা মুশকিল। তবে অভিধানগুলো ঘেঁটে দেখলে আরেকটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যায় যে শব্দ ব্যুৎপত্তি নির্ধারণে বাংলায় অনেক কাজ করা বাকি।

3 comments:

Tashfeen Mahmud said...

boss, mela din por apnar blog e dhuklam. eita ki font? khubi bhoyonkor, apnar blog e ei font ekdom e manacche na! tc

akkas said...

১৭৭৮ সালে ছাপানো প্রথম বাংলা ব্যাকরণে ব্যবহৃত হরফ থেকে নেওয়া। দেথতে তেমন ভাল নয়, তবে প্রথম বলে কথা।

dibyajyoti said...

র থেকে ড়-এর আমি অপনাকে দুটো ভালো উদাহরণ দিতে পারি:

১) কড়ার - চুক্তি বা অঙ্গীকার। এসেছে আরবি > ফারসি ক়রার্‌ (قرار) থেকে - আদি অর্থ "স্থিতিশীলতা", তার থেকে চুক্তি, ফরমান, ইত্যাদি ("স্থিতিশীল করার পদ্ধতি" অর্থে ?)

২) খোঁয়াড়ি - মাতলামি বা মদ্যপানজাত "hang-over"। এসেছে আরবি > ফারসি খ়ুমার্‌ (خمار) থেকে - ওই একই অর্থে।

---

"আজুড়ে" কথাটা যদিও আমি প্রথম শুনলাম, আমি এর একটা বিকল্প ব্যুত্‍‌পত্তির প্রস্তাব রাখতে চাই। আমাদের হলদিয়া অঞ্চলের (মেদিনীপুর জেলা) ভাষায় একটা শব্দ আছে - "আজোড়"। কোনও পাত্র বা বাসনকে "আজোড় ক'রে" দেওয়ার মানে হচ্ছে সেই পাত্র থেকে সমস্ত জিনিস বের করে নিয়ে খালি করে দেওয়া যাতে সেটা অন্য কোনও কাজে ব্যবহার করা যায়। (কথাটা কি "উজাড়" শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত? মনে হয় না।) এবার লক্ষ্য করুন, "আজোড় + ইয়া = আজুড়িয়া > আজুড়ে"। বাংলা স্বরসংগতির নিয়মে -ইয়া প্রত্যয়ের যোগে স্বাভাবিক ভাবেই আগের ও > উ হয়ে যায়। অর্থের দিক থেকেও এই ব্যুত্‍‌পত্তিটি মোটামুটি সংগতিপূর্ণ: "মন খালি করে" বক্তৃতা। অবশ্য "আজোড়"-এর ব্যুত্‍‌পত্তি কী হতে পারে সে সম্বন্ধে আমার কোনও ধারনা নেই।